বেশ অনেক দিন হয়েছে বাড়ি যাওয়া হয় নি। তাছাড়া টাকা-পয়সাও একেবারে শেষ হয়ে গেছে হাতের। লজিং-এ আসার পরে আর কোন টিউশনির চেষ্টা করি নি। ইচ্ছাও নাই। মেসে থাকতে টিউশনি করে যে টাকা পেতাম তা দিয়ে থাকা এবং খাওয়া চলে যেতো। বাড়ী থেকে মাসে মাসে যা পারতাম নিয়ে আসতাম, যা দিয়ে দৈনন্দিন খরচ মিটতো। এখন লজিং-এ আসার পরে থাকা-খাওয়ার চিন্তা মিটে গেছে, শুধু মাত্র দৈনন্দিন খরচের টাকা, যা আগের মতোই বাড়ি থেকে মেটানো সম্ভব হবে বিধায় আর কোন টিউশনির চিন্তা করি নি। তাছাড়া সময়ই বা কোথায়? দুই বেলা লজিং বাড়ির ছাত্রদের পড়ানোর পরে নিজের পড়াশোনার জন্যতো কিছু সময় অবশ্যই হাতে থাকতে হবে।
কোন এক দিবস উপলক্ষ্যে সাপ্তাহিক ছুটির সাথে আরও একদিন বাড়তি ছুটি যোগ হয়েছিল কলেজে। আমাদের দেশে দিবসেরতো অভাব নেই। আমার মনে হয় বছরে ৩৬৫ দিনের একটা বড় অংশ বিভিন্ন দিনের নামে অলরেডি বরাদ্দ হয়ে গেছে। কোনটা সরকারী, কোনটা
বেসরকারী আবার কোনটা দলীয়। এর মাঝে অনেকগুলো দিন আছে যেগুলোতে সরকারী আধাসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ছুটি অনিবার্য- স্কুল কলেজের জন্যতো বলারই অপেক্ষা রাখে না। যে দেশে কার্যদিবসগুলোর একটা বড় অংশ বিভিন্ন নামে ছুটির অজুহাতে কাজ-কর্ম বন্ধ থাকে সে দেশের উন্নয়নের পথে এর চাইতে বড় বাধা আর কি হতে পারে? এই জিনিসগুলো আগে কখনো এমনভাবে চিন্তাই আসে নি। কিন্তু দেশের বাইরে আসার পরে বুঝলাম এগুলো কি পরিমাণ বাড়াবাড়ি। এখানে দুই ঈদ উপলক্ষ্যে কয়েকদিন এবং জাতীয় দিবসের এক দিন ছুটির বাইরে কোন ছুটিই দেখি নি। এমনকি দেশে সর্বোচ্চ কর্তা ব্যাক্তি কিং-এর মৃত্যুতেও কর্মক্ষেত্রে ছুটির কোন প্রশ্ন কারো কাছে আসে না।যাই হোক, ছুটির ঐ বাড়তি দিনের খেয়ালে বৃহস্পতিবারের ক্লাশ শেষ করে লজিং বাড়ি থেকে দুপুরের খানা খাওয়ার পরে বাড়ির উদ্দেশ্যে বাসে উঠলাম। বাস থেকে নেমে পাঁচ মাইলের অধিক রাস্তা পায়ে হেঁটে বাড়িতে গিয়ে যখন পৌছলাম তখন সন্ধ্যা হওয়ার আরও কিছু বাকী আছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা তখনও তীর্যকভাবে আলোক বিতরণ করছে পৃথিবীর আমাদের এই অংশটার উপরে। চলে যাবে অল্প সময় পরেই আমাদেরকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে, যেভাবে আমার মমতাময়ী মা একদিন আমাদের জীবন আকাশকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে বিদায় নিয়েছিলেন। সূর্য আজ বিদায় নিলে কাল সকালে আবার যথারীতি ফিরে আসবে পৃথিবীকে আলোকিত করতে। কিন্তু মা আমার সেই যে আলোকউজ্জ্বল সময়গুলোকে পিছনে ঠেলে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন আর কোন দিনই ফিরে এলেন না; ফিরে আসবেনও না কোন দিন; ফিরে আসে না কেউ।
সেদিন যখন হসপিটালে মায়ের মৃত্যু সংবাদ বাড়িতে এলো তখনও সূর্যের অবস্থান আকাশের এই একই জায়গাটাতে ছিল। তখনও বুঝতে শিখি নি মৃত্যু কি, মৃত্যু কাকে বলে, বা মৃত্যু হলে কি হয়। কিন্তু এতটুকুন বুঝ আমার মধ্যে কাজ করছিল যে কিছু একটা হারালাম, যা কখনো আর ফিরে পাবো না। এই হারানোর বেদনায় যে কাঁদতে হবে তা জানতে তখনও শিখি নি; কিন্তু যখন দেখলাম আমার বড় দুই বোনসহ আমার ফুফু উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগলো তখন আমার কান্নার জন্য কোন বুঝের দরকার পড়ে নি। মরে যাওয়া কি তা না বুঝলেও আমার মা যে আর আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না তা বুঝতে কোন অসুবিধা হয় নি। আমার মনে আছে, আমি চিৎকার করে কান্না করছিলাম। আমার কান্না বন্ধ করার জন্য পড়সীদের মধ্য থেকে কতজন আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে এবাড়ি থেকে ওবাড়ি। কিন্তু আমার কান্না বন্ধ হয় নি।
কান্না বন্ধ হবে কিভাবে, আমিতো কাঁদি নি; কান্না এসেছে। কান্নাই আমাকে কাঁদিয়েছে। মেহেরপুর সদর হাসপাতাল থেকে মায়ের লাশ বাড়িতে এসে পৌছতে রাত বেশ হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি এক এক করে লোকে ভরে গেল। কেউ বা শব্দ করে কান্না করছে কেউ বা চোখের পানি ফেলছে নীরবে, আবার কারো বা বিষাদের ছায়া চেহারায় ফুটে রয়েছে চোখের পানি ছাড়া।
আমার কান্নার বেগ কমাতে না পেরে কেউ আমাকে বাড়ির পাশে আমাদের কাঁঠাল বাগানে নিয়ে গেল, যেখানে আমার মায়ের অন্তিম শয়নের জন্য কবর খোড়া হচ্ছিল হারিকেনের আলো জ্বালিয়ে। যিনি ছিলেন আমাদের পাঁচ ভাই-বোনের জীবনের নক্ষত্র, তাঁকে হারিকেনের আলোতেই নীরবে বিদায় দেয়া হবে কবরের অন্ধকার কুঠরীতে- যেখান থেকে কেউ কখনো আর ফিরে আসে না। আমার মা-ও আর ফিরে আসে নি কখনো। কিন্তু যে কান্না শুরু হয়েছিল সেদিন বিকেলে সূর্য ডোবার পূর্ব মূহুর্তে মায়ের বিদায়ের খবরের মধ্য দিয়ে সে কান্না ফিরে এসেছে আমাদের জীবনে বার বার। ফিরে আসা নয়, বরং বলতে হয়, সে কান্না আর আমাদেরকে ছেড়ে যায় নি কোন এক দিনের তরেও। সুন্দরভাবে সাজানো একটি সংসার শুধুমাত্র একজনের অনুপস্থিতিতে হারিয়ে ফেললো তার প্রাণ, যে প্রাণ আজও পর্যন্ত ফিরে আসে নি। সেদিনের সে সূর্য বিদায়ের পর পরদিন সকাল বেলায় আবার সেই একই রূপে ফিরে এসেছিল দুনিয়াবাসীর কাছে, কিন্তু আমাদের কাছে তা কোন মানেই বয়ে আনতে পারে নি শুধুমাত্র তার উপস্থিতি দেখানো ছাড়া, যা ছিল একটা আলোর পিন্ডলি মাত্র।
হঠাৎ দেখলাম পুরো বাড়িটাতেই কান্নার একটা রোল পড়ে গেল। চারিদিকে অবস্থানরত মানুষগুলোর একমূখী চলন পরিলক্ষিত হলো। লাশ নামানোর পরে আমার বড় দুই বোন আমার মায়ের লাশের উপর আছড়ে পড়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। আর আমার ভাই? যেন এক জীবন্ত লাশ। কোন শব্দ ছিল না মুখে, পাথর হয়ে গিয়েছিল যেন তার চেতনা। অনেকে তাকে ধরে যখন মায়ের লাশের কাছে নিয়ে এলো তখন তিনি আস্তে আস্তে মায়ের মাথার কাছে গিয়ে বসে পড়ে মায়ের মাথাটা বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। তার কান্নায় যে সমস্ত প্রাণে হৃদয় ছিল সেগুলো না কেঁদে পারে নি।
আমি আমার মায়ের নিষ্প্রাণ চেহারা দেখেছি। ভাইয়ের কান্না আমাকে কাঁদিয়েছে, বোনেদের কান্না আমাকে কাঁদিয়েছে, কাঁদিয়েছে আমার মায়ের নিষ্প্রাণ চেহারা। আমি বুঝতে পেরেছি, এই চেহারা আর কখনো হেসে উঠবে না সুন্দর হাসিতে। আমি বুজেছি, আমার মা আর কখনো কথা বলবে না, ডাকবে না আমাকে, ভাইকে বা বোনদেরকে। কোলে তুলে নেবে না আর কখনো আমার দুই বছর বয়সের ছোট ভাইটিকে, যে মা-বাবা এবং ভাই-বোন ছাড়া জগতের আর কিছুর সাথেই এখনো পর্যন্ত পরিচিত হতে পারে নি। তার এই স্বল্প গন্ডির পরিচিত জনদের মধ্য থেকে মমতাময়ী মা চলে গেলেন সবার আগে যার আঁচলের নীচে থেকে দুনিয়ার কত কিছু দেখার ছিল, কত কিছুর সাথে পরিচিত হবার ছিল।
এতদিন পরে আজ আর আমার মনে নেই মায়ের মৃত্যুতে আমার ছোট ভাইয়ের অভিব্যাক্তি কি ছিল। মনে নেই তাকে কে আগলে রেখেছিল- হয়তো বা আমার আব্বা, অথবা অন্য কেউ। হসপিটালে মায়ের মৃত্যুক্ষণ পর্যন্ত সে মায়ের সাথে ছিল। বেশী ছোট বিধায় তাকে সাথে নিয়ে গিয়েছিল মা যখন হসপিটালে যান। মৃত্যুর পর সে ফেরত এসেছে মায়ের লাশের সাথে।
আমার ভাই এবং বোনেরা কাঁদছিল, তুমি কেন চলে গেলে? আমরা আর কাকে মা বলে ডাকবো, কে আমাদেরকে আদর করবে? আমিও তাদের দেখাদেখি এই বলে কাঁদছিলাম, মাগো! আমি কাকে মা বলে ডাকবো? কিন্তু তখন বুঝি নি যে, এ শুধু মা বলে ডাকার প্রশ্ন নয় বরং তারও চাইতে অনেক বড় বড় প্রশ্ন জীবনের জন্য অপেক্ষা করছে।
একটা সময় আসলো, লাশ গোসল দেয়া হলো। গোসল দিয়ে যখন বের করা হলো, তখন একেবারে নতুন সাজে- স্বেতশুভ্র বসন। সাদার রং যে এত কালো জীবনের জন্য তা বুজেছে হারানোর বেদনায় মুহ্যমান হৃদয়। আর পরবর্তী দিনগুলোতে কালোর এই বিভিন্নমূখী রূপ বানান করে করে বলে দিয়েছে যে, ঐ সাদা আমাদের জীন্দেগীর জন্য কি কালো রূপের বার্তা দিয়ে গেছে।
তারপর যা হবার তাই হলো- মা আমার মারা গিয়ে লাশ হয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন, কিছু সময় সে লাশ আমাদের সামনে ছিল; কিন্তু এখন ঐ লাশটাকেও আর ধরে রাখতে পারলাম না। শোয়ায়ে দিতে হলো কবরের গহীন কুঠরীতে। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো কবরের পাশে যখন মাকে আমার সমাহিত করা হয় কবরের মধ্যে। শেষে আমার কচি হাত দিয়ে আমিও আমার মায়ের কবরের উপর তিন মুঠো মাটি দিয়ে মাকে আমার ইহ জীন্দেগীর মতো বিদায় দিয়ে এলাম। সাথে সাথে শেষবারের মতো বুঝে গেলাম যে, মা আমার এখানেই ঘুমিয়ে থাকবেন; আর কখনো আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না, আসতে পারবেন না।
বিদায় দিয়ে এলাম আমাদের জীবনের হাসি আর খুশীকে। আমাদের জীবন থেকে হাসি-আনন্দকে যে বিদায় দিয়ে এলাম তা বুঝতে খুব বেশী দেরী হলো না। এর পরের ইতিহাস সেই বাস্তবতার ইতিহাস, যে বাস্তবতার সিঁড়ি বেয়ে আমাদেরকে এগিয়ে চলতে হয়েছে পল পল করে। মায়ের মৃত্যুর পর কিছুদিন যাবত শুধু এই কষ্টটাই আমাদেরকে কাহিল করতো যে, আমাদের মা নেই। কিন্তু তার চাইতেও যে বেশী কিছু নাই হয়ে গেছে আমাদের জীবনে তা বুঝতে শুরু করলাম সেদিন থেকে যেদিন আমাদের সাজানো বাগানের মরে যাওয়া গোলাপের জায়গাটাকে পূরণ করার ব্যর্থ প্রয়াসে একটি নতুন মুখকে এনে হাজির করা হলো।
তোমাকে বলেছিলাম, মায়ের মৃত্যুর পরে হাসপাতাল থেকে যখন তাঁর লাশ নিয়ে আসা হলো তখন আমার ছোট ভাইয়ের অবস্থান বা তার আচরণ সম্পর্কে আমার তেমন কিছু মনে নেই। কিভাবে থাকবে? আমি নিজেইতো ছোট। আমারও চাইতে ছোট যে তার ব্যাপারে দেখার মতো নজর কি তখনও আমার হয়েছে? আমি জানি না মায়ের অনুপস্থিতির দিন থেকে তাকে কিভাবে বুঝ দিয়ে রাখা হয়েছিল মায়ের ব্যাপারে। তবে এতটুকু মনে আছে যে, রাতের বেলায় আমরা পড়তে বসতাম আর আব্বা তাকে বুকে নিয়ে শুয়ে থাকতেন। আদর করতেন তাকে, যাতে করে সে মায়ের শুন্যতাকে মনে করে কান্নাকাটি না করে। আব্বার বুকের উপরে প্রতি রাত্রে ঘুমিয়ে যেতো অপার নির্ভাবনায়। এক অকল্পনীয় ঝড়ো হাওয়ায় আমাদের সাজানো সংসার তচনছ হয়ে গেলেও তখনো মায়া-মমতা আব ভালবাসায় ভরপুর ছিল। আত্মীয়-স্বজন মাঝে মাঝে আসে, প্রতিবেশীরাও খোঁজ-খবর নেয় সুবিধা-অসুবিধার কথা জিজ্ঞেস করে।
এমনিভাবে চলমান এক সন্ধ্যায় দেখলাম আব্বা বাড়িতে নেই। মায়ের মৃত্যুর পরে প্রতিদিনই এমন হতো যে, সন্ধ্যার পরে আব্বা আমার ছোট ভাই রাকীবকে নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন- তাকে গল্প শোনাচ্ছেন, অথবা বুকের মধ্যে নিয়ে চুপ করে শুয়ে আছেন। সেই সন্ধ্যায় আব্বাকে তার সাথে না পেয়ে রাকীব কান্নাকাটি শুরু করে দিল। কারো কাছে খাবে না, কারো কোলে যাবে না বা কারো সাথে শোবে না- আব্বাকেই তার চায়। খাওয়ানোর চেষ্টা করা হলো, কিন্তু কাজ হলো না। কি করা যায় চিন্তা করতে করতে যখন কোন সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না তখন আমাদের বাড়িতে যে মেয়েটা রান্না-বান্নাসহ বাড়ির সব কাজ-কর্ম দেখা শোনা করতো সে ভাইকে ঘর থেকে আলো সরিয়ে আব্বার বিছানায় শোয়ার জন্য বললো এবং কোন কথা বলতে নিষেধ করলো। এরপর ওবায়েদকে নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে ভাইয়ের বুকে তুলে দিয়ে আসলো। পিতার বুকের উষ্ণ পরশ সে ভাইয়ের বুকে পেল কিনা তা আমি বলতে পারবো না। কিন্তু কিছু সময় পরে দেখা গিলে সে ভাইয়ের বুকের উপরে কি এক প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে গেছে।
ভাইয়ের বুকে পিতার প্রশান্তি মেলে কিনা আমি জানি না; কিন্তু আমাদের ভাই আমাদের জন্য সেই প্রশান্তি দেয়ার চেষ্টায় কোনদিনই কার্পন্য করে নি। আর আমার ছোট ভাই ঐ যে সেই সন্ধ্যায় আব্বার বুকের উষ্ণ পরশ থেকে বঞ্চিত হলো, তা আর কোনদিনই ফিরে পেল না। যা একবার যায় তা হয়তো আর কোনদিনই ফিরে আসে না।
No comments:
Post a Comment