Welcome Text

Welcome you to read daily important topics, quotes, discussion or news. You can share your comments or even new topics you like to be seen by the world

যে স্মৃতি শুধুই কাঁদায়

আব্বা বাড়িতেই ছিলেন। সালাম দিয়ে কুশল বিনীময় করে চলে গেলাম ঘরে। হাফসা- আমার ভাতিজী- আমার অত্যান্ত প্রিয়। তাকে নিয়ে সময় কাটালাম সন্ধ্যায়। রাত্রে আমার টাকার প্রয়োজনের কথা আব্বাকে জানালাম। সাথে এও বললাম যে, শুধু মাত্র কালকের দিনটা থাকতে পারবো- পরের দিনই চলে যেতে হবে। কারণ তার পরের দিন থেকে কলেজ খোলা। আব্বা কোন কথা বললেন না- মনে হলো কোন এক গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।
আমি জানি এই ডুবে যাওয়ার অর্থ। আমি জানি কেন আব্বার কাছে টাকা চাইলেই এমন গম্ভীর হয়ে যান। কেমন যেন এক অসহায়তা ফুটে উঠে তার চোখে মুখে।

তোমাকে আগেই বলেছি আমাদের আয়ের একমাত্র কৃষিকাজ। আমাকে টাকা দিতে হলে কোন একটা কৃষিজ দ্রব্য বিক্রী করতে হবে, যা রয়েছে বাড়িতে। এখন যা কিছুই বিক্রী করতে যাক না কেন তার অর্থ খুবই পরিষ্কার যে, সেটা আমাকে টাকা দেবার জন্য। আর এজন্য বিরোধীতা আসবে তার কাছ থেকে যাকে নিয়ে আসা হয়েছিল আমাদের দেখা-শোনার কথা বলে আমাদের মা মারা যাবার পরে। আজ সে দেখা-শোনাতো আমাদেরকে করছে; কিন্তু তার পদ্ধতি একেবারেই আলাদা। সহায় সম্পদ যা থাকে তা প্রধানত ফ্যামিলির সদস্যদের প্রয়োজন মিটানোর কাজে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য। কিন্তু আজ সে আমাদের দেখাশোনা করে যাতে করে সংসারের সম্পদ আমাদের প্রয়োজনে ব্যবহৃত না হতে পারে। এটাওতো দেখাশোনাই বটে।
নির্দিষ্ট দিনে আমার ফিরে যাওয়া হলো না- টাকার যোগাড় না হবার কারণে পরিকল্পিত সময়ের পরেও আরও ৩দিন থাকতে হলো। ঘরের কোন জিনিস বিক্রী করতে দেয়া হলো না আমার প্রয়োজন পূরণের জন্য। আগে বিরোধীতা ছিল শুধু মাত্র স॥মায়ের কাছ থেকে; কিন্তু এখন বিরোধীতা করার মতো আরও সদস্য আছে। আয়শার গর্ভে জন্মগ্রহণকারী দুছেলে এখন বেশ বড় হয়ে গেছে। তারাও মায়ের সাথ দিতে শিখে গেছে। বেচারা আব্বা একা কি করতে পারবেন?
কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে অনেক কিছুই করা যায়। কিন্তু যাকে বা যাদেরকে নিয়ে সংসার করা হচ্ছে বা করতে য় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে কিছু করার চেষ্টা সঠিক বলে বিবেচিত হতে পারে না। আর তাই আমাকে টাকা দেয়ার ব্যাপারে তাদের কাছ থেকে আসা বিরোধিতাকে ট্যাকেল করা সহজ হয় না আব্বার জন্য
যখন বাড়িতে থাকতাম তখন খাওয়ার সমস্যা আর আজ যখন বাড়ি থেকে দূরে তখন পয়সার সমস্যা। দুনিয়ার প্রায় সব স॥মাগুলো এমন হয় কেন? তারা কেন বোঝে না কোন একজনের তিল তিল করে গড়ে উঠা সংসারে গিয়ে পরের দিন থেকেই নিজের রাজ চালাতে পারছে এতেইতো সন্তুষ্ট থাকা উচিত- এমনটি আমি ভাবতাম।
দুজন মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফসল একটি সংসার যা তারা গড়ে তোলে তিলে তিলে একটু একটু করে। কত ত্যাগ-তিতিক্ষা, আশা-আকাংখা, স্বপ্ন-স্বাধনা জড়িয়ে থাকে এর সাথে। কতটা সময় ব্যায় হয়ে যায় একটি সংসারকে প্রয়োজন অনুযায়ি গোছাতে। আমি নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তদের কথা বলছি। স্বাধারণত দুইজন নারী-পুরুষ যখন এক হয়ে পুরো জীন্দেগী একত্রে কাটানোর ফয়সালা করে যাত্রা শুরু করে তখন তাদের প্রয়োজনিয় কিছুই প্রায় থাকে না। একটু একটু করে কিছু খেয়ে, কিছু না খেয়ে তাদের প্রয়োজনগুলোকে পুরণ করে। স্বামী সন্তানদেরকে নিয়ে নিজে অনেক সময় আধা খেয়ে, অনেক সময় না খেয়ে একজন নারী তার সংসারকে আগলে রাখে। সন্তানদের ভবিষ্যত চিন্তা করে কত কিছু থেকেই না নিজেকে বঞ্চিত রাখে। একসময় দেখা যায় প্রায় কিছু না দিয়ে শুরু করা সংসারে অতি দরকারী সবকিছুরই ব্যবস্থা হয়। একটু যেন স্বাচ্ছন্দ্য আসে, স্বচ্ছলতার একটা ক্ষীন হাসি যেন সংসারকে আকর্ষণীয় করে। এ এক সাধনা, এ এক সংগ্রাম, সংসারকে একটা গোছানো বা পরিপাটি রূপ দেয়, যার কোন সুনির্দিষ্ট পরিমাপ নাই। এটা নির্ভর করে যার যার অবস্থানের উপর।
নিয়তির নির্মম পরিহাসে যখন কোন নারীকে এই সংসার থেকে বিদায় নিতে হয় এবং সেই যায়গা এক নিমিষে অন্য এক নারীর আয়ত্বে চলে যায় তখনই পূর্বের সবকিছু তচনচ হয়ে যায়। যাদের ভবিষ্যতের আশায় এতকিছু করা তারা হয়ে যায় পরিত্যক্ত, অপাংতেয়, অনাকাঙ্খিত। কি নিদারূণ বাস্তবতা!
স্কুলে যাবার সময় হতো, অথচ খাবার রেডি হতো না। সকালের সেই মজাদার মুড়ি নাস্তা ইতিহাস হয়ে গেছে। কোন দিন ভাত রান্না হয়েছেতো তরকারী কেবল কোটাকুটি চলছে, কোন দিন তরকারী থাকলে ভাত নাই। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে এসে সকালের তৈরী বেঁচে যাওয়া খাবারগুলোর দৈনদশা দেখলে এমনিতেই হৃদয় ফেটে চোখে পানি চলে আসতো। অনেক চেষ্টা করেও সেগুলো পেটে যেত না, খেতে পারতাম না কোন ভাবেই। আরো কান্না পেত যখন মনে পড়তো খাবার রেডি করে আমাদের জন্য মায়ের পথচেয়ে অপেক্ষার চিত্র যখন সামনে এসে যেত। প্রথম প্রথম খুব কাঁদতাম, কাঁদতে যেন ভাল লাগত, মনটা কিছুটা হালকা হয়ে যেত। কিন্তু সময় এমন আসলো যে, কাঁদতেও ভুলে গেলাম। কার কাছে কাঁদবো, কে আছে শোনার আমাদের কান্না? দু@খে কাতর হয়ে বাড়ির বাইরে রাখা গরুর গাড়ীর উপরে একা একা শুয়ে থাকতাম রাজ্যর বেদনা বুকে নিয়ে। ছোট ভাইটার কষ্ট আরো বেশী করে পীড়া দিত। কিভাবে আমি আমাদের সেই দিনগুলোর বর্ণনা দেব তা আমার জানা নাই। আমার ভাষা জ্ঞান এতটা উন্নত নয় যে আমি তার বর্ণনা করে তোমাকে বোঝাতে পারব। চৈত্রের খরা রোদ্রে ক্ষুধায় কাতর ছোট ভাইটাকে সাথে নিয়ে উচ্ছিষ্ট প্রায় পড়ে থাকা ভাতগুলোকে গলধকরণের জন্য শুকনা মরিচ হাতে যখন প্রতিবেশীদের বাড়িতে ঘুরে বেড়াতাম কার চুলায় আগুন আছে তা খুঁজতে তখনকার অবস্থা তোমাকে কাগলে লিখে বুঝাতে পারব? শুকনা মরিচগুলো পুড়ায়ে বাড়িতে এসে তা দিয়ে ভাত মাখায়ে দু ভাই মিলে খেতাম – শুধু এটুকু বললে তুমি কি বুঝতে পারবা আমার অবস্থা? পারবা না, আর আমিও তোমাকে বুঝাতে পারব না। এটা শুধু সেই বুঝতে পারবে যে এর ভুক্তভোগী। দুই বোন তখনও স্কুলে থাকতো। আমার স্কুল তাদের অনেক আগেই ছুটি হয়ে যেত- আমি চলে আসতাম বাড়িতে। আমার বড় ভাই পড়তো কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজে। কুষ্টিয়া শহর থেকে দূরে গ্রামের কোন এক বাড়িতে লজিং থাকত- মাঝে মাঝে বাড়িতে আসতো। তখন রাজ্যের অভিযোগ তার কাছে করতাম। মনে হতো একমাত্র সান্তনার জায়গা, যদিও কিছুই করতে পারত না সেসব শুনেও।
মাঝে মাঝে যখন ভাই-বোনদের কেউ থাকত না বাড়িতে আর কষ্টটা খুব বেশী করে পীড়া দিত, বুকের ভিতরে কোথাও যেন ফেটে গিয়ে রক্ত ঝরার কষ্ট অনুভব হতো তখন আমার ছোট ভাই সাকীবকে সাথে নিয়ে মায়ের কবরের কাছে চলে যেতাম। যেয়ে কবরের একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কোন কথা বলতাম না, কোন অভিযোগ করতাম না। শুধু কবরের পানে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কেমন যেন যন্ত্রণা মিশ্রিত ভাললাগায় মনটা ভরে যেত। মাঝে মাঝে এমনিতেই দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ত। সাকীবও মনে হয় বুঝতে পারত। বুঝতে পারত এটা আমাদের সান্তনার জায়গা। অভিযোগ করা নয়, অনুভব করা। অনুভব করা যে, একদিন যিনি ছিলেন আমাদের সমস্ত সুখের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে তিনি আজ নীরবে শুয়ে আছেন এখানে। হয়তো বা তার প্রিয় আমাদেরকে দেখতে পাচ্ছেন কবর থেকে, আমাদের কষ্ট অনুভব করতে পারছেন। সাকীবও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকত আমার পাশে, কোন কথা বলত না, কোন প্রশ্ন করতো না।

No comments: