না, সেই গতি আজও আসে নি জীবনে। আর যে কখনো আসবে সে ভরসা করার মতো কোন যুক্তিও আমার কাছে আজ আর অবশিষ্ট নাই। জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে আজ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি এখান থেকে ট্র্যাক চেঞ্জ করে অগ্রসর হবার আর কোন রাস্তা নেই।
কলেজে ভর্তি হয়ে প্রথম ঘর থেকে বের হয়ে যে সমস্যা সবচেয়ে বড় হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল তা হলো থাকার জায়গা। বাড়ির যা অবস্থা তাতে আবাদী জমি থেকে যে ফসল আসে তা দিয়ে খাওয়া-দাওয়া বাবদ যে খরচ এবং দৈনন্দিন খুচরা প্রয়োজন কোন রকমে মিটে যেতে খুব একটা সমস্যা হয় না। কিন্তু সেখান থেকে মাসে মাসে একটা বড় এ্যামাউন্টের টাকা আনা সম্ভব নয় মোটেই। আর তাই বিকল্প ব্যবস্থা অবশ্যই একটা খুঁজে নিতে হবে।
প্রশ্ন করতে পারো, অবস্থা যদি এমনটিই হয় তবে বাড়ী থেকে এতটা দূরের কলেজে ভর্তি হবার প্রয়োজনটা কি পড়ল। প্রয়োজন কি পড়ল তার জবাব অত্যান্ত সহজ। জীবনের মানেইতো হলো স্বপ্ন। জীবনের রঙিন স্বপ্ন থেকে বিয়ে-ভালবাসা। স্বামী-স্ত্রীর এক রঙিন স্বপ্ন থেকে তাদের সন্তানের জন্ম। আর তারপরে সেই সন্তানকে নিয়েই তাদের যত সব স্বপ্ন। সে স্বপ্ন থেমে থাকার নয়, থেমে থাকার জন্যও নয়। স্বপ্নই যদি না
থাকলো তবে আর জীবন থাকল কোথায়? মানুষ স্বপ্ন দেখে বেঁচে থাকার জন্য। মানুষ বেঁচে থাকে স্বপ্ন দেখতে দেখতে। এই স্বপ্ন দেখা যেদিন শেষ হয়ে যায় সেদিন আর সে বেঁচে থাকে না। মানুষতো তখনই নিজে থেকে নিজেকে সরিয়ে দিতে পারে যখন সে তার সকল স্বপ্ন থেকে দূরে পড়ে যায়। জীবনের পুরোটা সময় ধরেই বিভিন্ন স্বপ্ন আবর্তিত হয়। কারো স্বপ্ন বড়, কারো স্বপ্ন ছোট; কারো স্বপ্ন মাত্র একটি বাসের হেল্পার হওয়া পর্যন্ত আবার কারো স্বপ্ন প্লেনের পাইলট হওয়া। আর সেই স্বপ্নই আমাকে বাড়ি থেকে অনেক দূরে কুষ্টিয়া সরকারী কলেজে ভর্তি হতে বাধ্য করেছে।
থাকলো তবে আর জীবন থাকল কোথায়? মানুষ স্বপ্ন দেখে বেঁচে থাকার জন্য। মানুষ বেঁচে থাকে স্বপ্ন দেখতে দেখতে। এই স্বপ্ন দেখা যেদিন শেষ হয়ে যায় সেদিন আর সে বেঁচে থাকে না। মানুষতো তখনই নিজে থেকে নিজেকে সরিয়ে দিতে পারে যখন সে তার সকল স্বপ্ন থেকে দূরে পড়ে যায়। জীবনের পুরোটা সময় ধরেই বিভিন্ন স্বপ্ন আবর্তিত হয়। কারো স্বপ্ন বড়, কারো স্বপ্ন ছোট; কারো স্বপ্ন মাত্র একটি বাসের হেল্পার হওয়া পর্যন্ত আবার কারো স্বপ্ন প্লেনের পাইলট হওয়া। আর সেই স্বপ্নই আমাকে বাড়ি থেকে অনেক দূরে কুষ্টিয়া সরকারী কলেজে ভর্তি হতে বাধ্য করেছে।
এমন কিছু অদ্ভূত অদ্ভূত চিন্তা তখন মাথায় কাজ করতো যা আজ মনে পড়লে নিজেকে বড় বোকা মনে হয়। যখন মাত্র একশ বিশ টাকা মেসের সিট ভাড়া এবং তিনশ টাকা মাসিক খাবার খরচ যোগাড় করতে দুইটা টিউশনি করতে হতো তখন রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে বড় বড় দালানগুলোর বাইরের অংশে ফুলগাছে সাজানো বারান্দাগুলো দেখতে দেখতে মনে মনে ভাবতাম, এরা খামোখাই এতোটা জায়গা ফেলে রেখেছে, যা কোন কাজেই আসে না- কি দরকার এই ফুলগাছগুলোর? এই শহরে আমার মতো কত শত ছাত্র যখন মেসে একটা সীটের জন্য হয়রান হয়ে থাকে তখন এরা কেন এই জায়গাগুলো ফেলে রাখে! কেন ওদের ঐ ফেলে রাখা জায়গাগুলোও নিডি মানুষগুলোর ব্যবহার করার সুযোগ থাকে না? তাদের যদি ফুল গাছ রাখার জন্য আলাদা রুম থাকে তবে যাদের নাই তাদের কেন বাস করার জন্যও একটা রুম না থাকে?
টিউশনি জোগাড় করা খুব সহজ কাজ নয়। আমার মতো কত ছাত্রইতো টিউশনির জন্য চেয়ে থাকে। ২০০ টাকার একটা টিউশনি যোগাড় করতে কত জনকে না বলতে হয়। যারা একটু চৌকশ বা যাদের যোগাযোগ বা পরিচিতি ভাল তারা একটা ছেড়ে অধিকতর ভালো আরেকটা ধরে অনেক সময়। তাদের কাছ থেকে পাওয়া দুটা টিউশনি দিয়ে আমার ইন্টারমিডিয়েট পড়া শেষ হয়েছে। কিন্তু বড় ক্লান্ত হয়ে গেছি আমি। এই ক্লান্তি দেহের যতখানি নয়, তারও চাইতে বেশী মনের। আর তাই শেষ পর্যন্ত লজিং খুঁজে পেতে সিদ্ধান্ত নিলাম। লজিং-এর সমস্যা সম্পর্কে যে আমি জানি না তা নয়- দুই বেলা লজিং মাষ্টারের ছেলে-মেয়েদেরকে পড়ানোর পরে নিজের পড়া-লেখার সময় করে নেয়া সহজ নয়। কিন্তু কমপক্ষে নিশ্চিন্ততাতো থাকবে। বার বার অন্যদেরকে টিউশনি খুঁজে দিতে অনুরোধ করতে হবে না।
এতোটা স্ট্রাগল করে যে পড়া-লেখা তার উদ্দেশ্যতো এটা অবশ্যই ছিল না যে শুধুমাত্র সমাজে শিক্ষিত বলে পরিচিতি পাওয়া। স্বপ্ন যেমন ছিল ফ্যামিলির, তেমন স্বপ্ন ছিল নিজেরও যে, একদিন কষ্ট করে হলেও লেখাপড়া শিখে ঐ বড় বড় বিল্ডিংওয়ালা মানুষদের মতো অত বড় হতে না পারলেও তাদের থেকে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে স্বচ্ছলতার সাথে জীবন যেন যাপন করতে পারি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে; পরিবারের মুখে একটু নির্মল হাসি ফুটাতে পারে। কিন্তু আজকের পাওয়ার সাথে সেই স্বপ্নের মিল কোথায়?
দীর্ঘ দিন চেষ্টা করে করে কত জায়গায় ঘুরে ঘুরে সরকারী চাকরীর বয়স যখন শেষ হয়ে গেল তখন অন্য অনেকের মতো আমার মাথায়ও যে বহুকষ্টে অর্জিত সার্টিফিকেটগুলো ছিড়ে ফেলার চিন্তা আসে নি তা নয়। কিন্তু না, ছিড়তে আমি পারি নি। ছিড়েই বা কি হবে, আর না ছিড়েই বা কি হবে। ওগুলো যদিও আজ পর্যন্ত কোন কাজে আসে নি তবুও যত্ন করেই রেখে দিয়েছি সেগুলোকে। কেন তা করিছি তা নিজেও জানি না। না রাখলে কি হবে বা রাখলে কি হবে সে হিসাব না করেই রেখে দিয়েছে। কিজানি হয়তো বা এরই মধ্যে আমার অতীত লুকিয়ে আছে তাই। হয়তো এরই মধ্যে আমার স্বপ্ন এবং কষ্ট মাখানো একেকটি দিনের কাহিনী লেখা আছে, তাই। কিজানি, হয়তোবা তাও নয়। এই রেখে দেয়াটা হয়তোবা এরকম যেমন কোন একজনের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে তার কাছ থেকে ভালবাসা আদায় করার জন্য কারো জীবনের মুল্যবান সবকিছু হারিয়েও তা না মিললেও ভালবাসার জনের অতিমূল্যবান ছবিখানা কখনোই হাতছাড়া হতে দিতে চাই না, তেমন।
আজ যে কাজ আমি করছি তার জন্য এতোটা সময় নষ্ট করে এই সার্টিফিকেটগুলো অর্জন করার কোন দরকার ছিল না। এগুলো অর্জন করতে বাড়তি যে ৮/৯ বছর সময় ব্যয় হয়েছে তা না করলেও চলতো। জীবনের অর্জন শুরু হতে পারতো আরও ৮/৯ বছর আগে থেকে। আরো আগেই কাজে আসতে পারতাম পরিবারের অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। কাজতো এই যে লেখা জিনিস দেখে দেখে কম্পোজ করা। এটা করার জন্য এস.এস.সি পাশেরও কি জরুরত আছে? যদি এস.এস.সি পাশ করার পরেও শুরু করতাম তবুও ৮/৯ বছর সময় হাতে পেতাম, যা কোনই কাজে আসলো না।
শুকরিয়া আমার অন্তর থেকেই আসে সদা সর্বদা আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট ওসমানের উপর। না, ওসমান নয়; তাকে আমি ওসমান ভাই বলে ডাকি। ওসমান ভাই আমাকে অনেকবার বলেছে কেন তাকে ভাই বলি; নাম বলেইতো ডাকতে পারি। সেতো তার চাইতে বয়সে অনেক ছোট; তাকে ভাই বললে নিজের কাছে খারাপ লাগে। কিন্তু আমি তার এই খারাপ লাগাকে দাম দেই নি।
এই ঢাকা শহরে এসেছিলাম চাকুরীর সন্ধানে। কারণ আমাদের দেশে পড়ালেখা করে চাকরী মানেইতো ঢাকা শহর। তার বাইরে কতটুকুই বা ব্যবস্থা আছে। অনেক দিনের প্রচেষ্টা যখন আমাকে সেই সোনার হরিণ পাওয়ার কোন পথই দেখিয়ে দিল না এমনি এক সময়ে ওসমানের সাথে আমার পরিচয়। পরিচয় বিভিন্ন মানুষের সাথে বিভিন্নভাবে হতে পারে- সেটা মনে রাখার মতো কোন বিষয় সব সময় হয় না। কিন্তু ওসমানের সাথে পরিচয় মনে রাখার মতো হলো; খুঁজে পেল তার আন্তরিকতা।
আন্তরিকতা এর আগেও পেয়েছি আমি। কিন্তু তখনকার সেই আন্তরিকতা আর এই আন্তরিকতার মধ্যে অনেক পার্থক্য অনেক। আব্বার লেখা চিঠিটা যখন কলেজের কমনরূম কেয়ার টেকার হাসিমের হাতে দিলাম তখনই সে বসতে দিল তার পাশে, ক্যান্টিন থেকে চা আনিয়ে খাওয়ালো। এর পরে একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো, ওনার সাথে যাও সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। সেই একজনকেতো তখন চিনলাম না কিন্তু চিনলাম পরে। আর পরে যখন চিনলাম তখন আমি নিজেই ঐ একজনের সাথের হয়ে গেছি।
কেয়ার টেকার হাসিম যখন ছুটিতে বাড়ি এসেছিল তখন আব্বার সাথে তার দেখা হয়েছিল। আর সেই সময়ই তিনি তার সাথে আমার ব্যাপারে আলাপ করেছিলেন। সেই কথার সূত্র ধরে আব্বা আমাকে তার সাথে দেখা করতে বলেছিলেন থাকা ব্যপারে তার সহায়তা পাবার জন্য। নিজে যে মানষিকতার তার সখ্যতাও ছিল সেই সব ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের সাথে। হাসিম আমাকে সহযোগিতা করেছে একটি ছাত্র সংগঠনের কলেজ শাখার আসিক হায়দারের হাতে দিয়ে। সেই আসিকের ছায়ায়ই আমার ছাত্র জীবনের বাকী সময়টা কেটে গেছে। ধন্য হয়েছে তার আন্তরিকতায়; অন্তত থাকার ব্যবস্থাতো তাৎক্ষণিকভাবে হয়ে গেছে।
স্কুলের শীর্ষ পরীক্ষায় উত্তির্ন হয়ে যখন কলেজে পড়ালেখার জন্য গেলাম তার আগ পর্যন্ত আমার মাথায় ছিল না কোন দলের প্রতি শ্রদ্ধা বা ঘৃণা কোনটাই। কোনদিন এব্যাপারে চিন্তা করতে শিখিনি। কিন্তু কলেজের দোরগোড়ায় পা দিয়েই ক্লাসে ঢোকার আগেই ঢুকে গেলাম ডান বামের চক্করে। না, এতে আমার কোন লাভ বা খুব একটা ক্ষতি কোনটাই হয় নি বৈষয়িক দিক থেকে। কারণ, যে নরম নিরীহ মন নিয়ে বাড়ি থেকে এসেছিলাম সেই মানষিকতায় রয়ে গিয়েছিল বরাবর। অতিরিক্ত উচ্ছলতা যেমন ছিল না চাল চলনে তেমন নেতৃত্ব দেয়ার কোন যোগ্যতাও প্রকাশ পায় নি কোন দিন কারো কাছে। তাই আমাকে সামনে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে কারো তরফ থেকেই কোন তাগাদা আসে নি। দ্বায়িত্ব শুধুমাত্র এটুকুই ছিল যে, মিছিল এবং মিটিং-এ হাজিারা দিতেই হতো। এখানে হাজিরা না দেয়ার সুযোগ ছিল না।
তখনই আমার মনে এই প্রশ্ন বার বার এসেছে- কেন এমন? এটারই নাম কি সচেতনতা- রাজনৈতিক সচেতনতা? না, তখনও যেমন আমি তা মনে করে নি, আজও করি না। বরাবরই এটা ভেবে হয়রান লাগে যে, কিভাবে রাজনৈতিক দলগুলো সরলমনা ছাত্রদের মানষিকতাকে ডাইভার্ট করে দেয়। যার প্রেক্ষিতে কলেজের ক্লাশগুলোর চাইতে রাজনৈতিক মঞ্চগুলো তাদের কাছে আকর্ষণের বিষয় হয়ে যায়। প্রত্যেক ব্যবসার জন্য যেমন পুঁজির দরকার হয়, এই রাজনীতির পুঁজি হলো জনগণ। জনগণ যার সমর্থনে যত বেশী হবে রাজনীতি তার জন্য তত সফল। কিন্তু এই জনগণ! কি মেলে তাদের? কত শত আশাইতো তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু তারপরে? বাস্তবতা কি সেগুলো তাদের সামনে এনে দেয়? যাদেরকে দিয়ে ব্যবসা তারাই থাকে বঞ্চিত। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই মানুষগুলো কিসের নেশায় তাদের পেছন ছাড়ে না? কিসের নেশা শত অব্যবস্থাপনা দেখার পরেও তাদের সাথে লেগে থাকতে তাদেরকে বাধ্য করে? এ প্রশ্নের জবাব আজও খুঁজে পায় নি আমি।
আজ যখন সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর সঞ্চয়কে বাক্সের এক কোনায় রেখে দিয়ে সকাল বেলায় দুটা রুটি খেয়ে এবং হাতে দুপুরের খানার বক্সটা ধরে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায় এবং সারাটা দিন নিরন্তর কাজের মধ্যে ডুবে থেকে সন্ধ্যা বেলায় খালি বাক্সটা হাতে ঝুলাতে ঝুলাতে ফিরে আসি মাথা গোঁজার ঠাইটুকুর উদ্দেশ্যে তখন মনে হয় জীবনটা কি এই খালি বাক্সটার মতো নয়? এক সময় কত আশা-আকাংখায় ভরপুর ছিল জীবনটা। সেই আশা একদিন সত্য হয়ে ধরা দেবে আমার হাতে। কত স্বপ্ন, কত কল্পনার রঙিন জাল। কোথায় আজ? হারিয়ে গেছে না সব কিছুই? জীবনটা হয়ে গেছে না এই খালি বাক্সটার মতো যেখানে না আছে আর কোন আশা, না কোন স্বপ্ন; শুধুই বয়ে বেড়ানো। ফেলে দিতে পারি না, তাই বয়ে বেড়ানো। জীবনটাও যেন আজ ফেলে দিতে না পারার ফলে বয়ে বেড়ানোর মতো হয়ে গেছে।
No comments:
Post a Comment